শনিবার, ২৩ মে ২০২৬, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন

প্রান্তিক স্কুলে শিক্ষার্থীদের বাংলা-ইংরেজি পঠন দক্ষতা কম: ইউএনও কাউছার হামিদ
বাংলাদেশকে যদি আমরা একটি উন্নত রাষ্ট্রের পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে আমরা যেটা ব্যবহার করতে পারি তা হলো শিক্ষা। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী নেতার বক্তব্যেও আমরা দেখি যে, পৃথিবীকে পরিবর্তন করার সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হলো শিক্ষা। এর বাইরে উন্নত রাষ্ট্রগুলো তাদের উন্নয়নের জন্য আলাদা কোনো ভিন্ন ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করেনি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেক্ষাপট যদি আমরা দেখি, সেখানে ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের যুদ্ধকালীন সময়েও অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে ভয় পাননি। বর্তমান সময়েও দক্ষিণ কোরিয়ায় অভিভাবকরা তাদের আয়ের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যয় করেন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি দেখি, আমাদের সংবিধানে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা হয়েছে। পাশাপাশি অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করার জন্য মিড-ডে মিল চালু করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ড্রেস, ব্যাগসহ অন্যান্য উপকরণও প্রদান করা হচ্ছে।
কিন্তু আমরা লক্ষ্য করেছি যে, আমাদের প্রান্তিক পর্যায়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজি পড়ার দক্ষতা সন্তোষজনক নয়। বাস্তব চিত্র হচ্ছে, অনেক শিক্ষার্থী বাংলা এবং ইংরেজি পড়তে পারে না। ফলে তারা যখন হাইস্কুল পর্যায়ে যায়, তখনও বাংলা ও ইংরেজি পড়ার ক্ষেত্রে দুর্বল থেকে যায়।
লাকসাম উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার থাকা অবস্থায় আমি একটি প্রতিযোগিতা করি। সেই প্রতিযোগিতায় ক্লাস্টার থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আসে। এবং যে স্কুলটি প্রথম হয়েছে, সেই স্কুলেরও প্রায় দশ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারে না। অর্থাৎ, যে স্কুলটি পুরো এলাকার মধ্যে সবচেয়ে ভালো স্কুল হিসেবে বিবেচিত, সেই স্কুলের অবস্থাও এমন। তাহলে প্রান্তিক পর্যায়ের স্কুলগুলোর অবস্থা সহজেই অনুমান করা যায়।
বিভিন্ন জাতীয় ও গবেষণা পর্যায়ের মূল্যায়নে দেখা যায়, প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পাঠে দুর্বল এবং প্রায় ৭৫ থেকে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি পাঠে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। (সূত্রঃ দা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)

বর্তমান কলাপাড়া উপজেলায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করতে গিয়ে দেখি যে, কলাপাড়া উপকূলীয় উপজেলা হিসেবে ধুলাসার, লতাচাপলি, লালুয়া, চম্পাপুরসহ একেবারে প্রান্তিক এলাকার স্কুলগুলোতে শিক্ষার্থীদের পঠন দক্ষতা অনেক কম।
এর কারণ হিসেবে আমি দেখেছি, অনেকাংশে আমাদের রেজিস্টার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো, যেগুলো সরকারিকরণ করা হয়েছে, সেই স্কুলগুলোর শিক্ষকদের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। আমাদের স্কুলগুলোতে শিক্ষক সংকটও রয়েছে।
এছাড়াও অভিভাবক পর্যায়ে অসচেতনতা দেখা যায়। কারণ প্রান্তিক পর্যায়ের অভিভাবকদের অনেকেই মাছ ধরা থেকে শুরু করে কৃষি কাজে ব্যস্ত থাকেন, ফলে সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি তারা ততটা মনোযোগী নন।
ফলে এই বাচ্চারা স্কুলে আসলেও বাংলা ও ইংরেজি পড়ার দক্ষতা তৈরি হচ্ছে না। আমরা তাদের গণিতসহ অন্যান্য বিষয় শেখাতে চাচ্ছি, কিন্তু বাংলা ও ইংরেজি পড়ার দক্ষতা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ হওয়ায় মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা দূরুহ হয়ে পড়েছে।
আমি একটি স্কুল পরিদর্শন করে দেখেছি এবং একজন হাইস্কুলের ইংরেজি শিক্ষক বলেছেন যে, তার স্কুলের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ শিক্ষার্থী ইংরেজি পড়তে পারে। তার মানে হলো, হাইস্কুল পর্যায়েও অর্ধেক শিক্ষার্থী ইংরেজি পড়তে পারে না। এটা যদি আরও পেছনে গিয়ে দেখা যায়, তাহলে বোঝা যায় যে প্রাথমিক পর্যায়েই তাদের বড় একটি অংশ বাংলা ও ইংরেজি পড়তে পারে না।
উপজেলা প্রশাসন, শিক্ষক, অভিভাবক এবং উপজেলা শিক্ষা অফিস যদি একসাথে কাজ না করি, তাহলে দেখা যাবে প্রাথমিক শিক্ষা, যেটা আমাদের মূল ভিত্তি এবং বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, সেটার মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাবে।
সরকার প্রাথমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে বই দিচ্ছে, অন্যান্য উপকরণ দিচ্ছে, অবকাঠামো উন্নয়ন করেছে এর পরও কেন এই ঘাটতি আছে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
এই ঘাটতি যদি আমরা উত্তরণ করতে না পারি, তাহলে আগামী দিনে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে এবং আমরা মানসম্মত শিক্ষার্থী তৈরি করতে পারব না এবং শিক্ষার্থীরা স্কুলমুখী কম হবে, স্কুলের প্রতি তাদের আগ্রহ অনেক কমে যাবে।
–কাউছার হামিদ, উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা, কলাপাড়া, পটুয়াখালী।।
© All rights reserved 2022 © aponnewsbd.com
Leave a Reply